শাপে বর * সুপর্ণা ঘোষ

ডিসেম্বরের শুরুটা বেশ টান টান উত্তেজনায় কাটছিল। সবে সবে জন্মদিন গেছে তাই টুপটাপ গিফ্ট ও একের পর এক ভালো খবর। এসব নিয়ে বেশ উত্তেজিত ও ফুরফুরে মেজাজে আছি, এমন সময় আমার কোম্পানির HR এর তলব। এখানে বলে রাখি, আমার কোম্পানির HR কেবিনে প্রবেশ খানিকটা শনির দশায় প্রবেশের সমতুল্য বলেই ধরে নেওয়া হয়। সহকর্মী দের সহানুভূতি মাখা চাওনি এবং অল দা বেস্ট গোছের দু-একটি বাক্য পেরিয়ে যখন প্রবেশ করলাম , তখন সামনে সহাস্য বদনে অধিষ্ঠান করছেন স্বয়ং সিনিয়র HR. 

আমাকে দেখে এক গাল হেসে বসার জন্য একটি চেয়ার দেখিয়ে দিলেন এবং কিছু সেকেন্ডের মধ্যেই আমার কাজের প্রশংসায় প্রায় ফেটে পড়লেন। আমি ততক্ষনে প্রহর গুনতে শুরু করে দিয়েছি। কথায় আছে ‘ কুকুরের পেটে ঘি সহ্য হয়না।’ ঠিক তেমনি এমপ্লয়ী দের পেটে প্রশংসা। বুঝে গেলাম আসন্ন বিপদ উপস্থিত। খুব চেষ্টা করে মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে যখন সবে চেয়ার টিতে বসেছি, HR জানালেন কোম্পানী আমার কাজে খুশি হয়ে আমাকে প্রমোশন দিয়েছে আর ঠিক তার সঙ্গেই বলে বসলেন কোম্পানী চাই আমি শক্ত হাতে কোম্পানীর দুর্বল একটি ব্রাঞ্চের দায়িত্ব নিই। এই দুটি খবর শুনে আমি এবার আনন্দে আত্মহারা হতে যাব আর ঠিক সেই সময় উনি জানালেন আমার ট্রান্সফার হয়েছে বেহালায় অবস্থিত ব্রাঞ্চে। আনন্দের বেলুনটিতে যেন সেফটিপিন দিয়ে ফুটো করে দিয়ে উনি দূরে বসে হাত তালি দিতে শুরু করলেন।

এবার সমস্যাটা হল আমি থাকি সুদূর বেলঘড়িয়ায় আর আমাকে যেতে হবে বেহালা। নেট ঘেঁটে বুঝলাম আমার ডিউটি আওয়ারের হিসেবে সকালে এবং রাতে কেবল মাত্র একটি করেই ট্রেন আছে (মাঝেরহাট লোকাল)। যারা ভাবছেন মেট্রো থাকতে এত চিন্তা কিসের, তাদের বলে রাখি মেট্রোর রুটে যেতে হলে আমার ঘর থেকে অফিস অব্দি সর্বসাকুল্যে ৪টি বাহন( টোটো-ট্রেন-মেট্রো-অটো) ব্যবহার করতে হয়, যা সময় এবং বেশ খরচা সাপেক্ষ। ট্রেন বা মেট্রো যেভাবেই যায়না কেন সময় লাগবে দু ঘন্টার বেশি, মানে আসা যাওয়া মিলিয়ে সাড়ে চার ঘণ্টা।
বাড়ি ফিরে বুঝলাম মন টা বেশ ভারী। পরের দিনই জয়েনিং। মনকে অনেক শান্ত করার চেষ্টা করে যখন শুলাম ঘড়িতে বাজে রাত ১২.৩০, আমাকে উঠতে হবে ভোর ৬টা। মনে হল মনটার আরেকটা পা ও মুচকে গেল।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল এলার্ম বাজার কিছু আগে। বুঝলাম অনেক চেষ্টা করেও মনটাকে ঠিক করতে পারছিনা। ঘরের ভেতরটা কেমন মেঘলা হয়ে আছে, তার উপর ঠান্ডা টা ও বেশ জাকিয়ে পড়েছে। তৈরি হয়ে বেরোনোর আগে ঠাকুর প্রণাম করতে গিয়ে বলেই ফেললাম ‘কষ্ট যদি দাও হে প্রভু , শক্তি দিও সহিবারে’।
৭.৪৫ এর গেদে মাঝেরহাট লোকাল। ফাঁকা ফাঁকা ট্রেন, জানলার ধারে একটি সিটে বসে পড়লাম। জানলা গুলো বন্ধ, ঠান্ডা হওয়া দিচ্ছে। যে দু-তিন জন রয়েছেন তাদের একজন, কাল রাতে হয়ে যাওয়া বউ ও ছেলের সাথে ঝগড়ার ফিরিস্তি দিচ্ছেন এবং অন্যেরা তার ভুল গুলি শুধরে দিয়ে শিখিয়ে দিচ্ছেন আর কি কি উপায়ে বৌমাকে টাইট দেওয়া যায়। বেশ মনযোগ দিয়ে খানিকক্ষণ তাদের গল্প শুনে হটাৎ আমার মনে পড়লো আরে আমি তো নতুন অফিস যাচ্ছি। তাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে জানলার দিকে চাইতেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাওয়ার জোগাড়। সুদূর প্রসারী জল, টোপর দেওয়া নৌক, পরিপাটি করে সাজানো বাগান, ভীষণ চেনা চেনা। ট্রেন স্টেশন এ থামলে, জানলা দিয়ে দেখলাম স্টেশন এর নাম প্রিন্সেপ ঘাট, এবং আমি যে ট্রেনটিতে আছি এটি চক্র রেল। কিছু কাল আগে অব্দি এটি আমার একটি আক্ষেপের জায়গা ছিল, যে আমি চক্র রেলে চরিনি। প্রতিবার গঙ্গার ধার, প্রিন্সেপ ঘাট বা আহিড়ী টোলা এলে এটি ছিল আমার একটি মাত্র অপ্রাপ্তি। মুর্শিদাবাদে আমার বাড়ির খুব কাছেই ভাগীরথী নদী, ছেলে বেলা বা আমার বড় হয়ে ওঠার অসংখ্য স্মৃতিতে এই গঙ্গা বা ভাগীরথী ভীষণ ভাবে জড়িয়ে। লক্ষ্য করলাম আমার মনের মেঘটা সরে গিয়ে এক আকাশ রোদ করেছে।

 

*আমার লেখায় বানান ভুল থাকে, সম্ভব হলে ধরিয়ে দেবেন।ধন্যবাদ*

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

About Author

“মেঘ বৃষ্টি” আসলে আমার ডাইরির পাতা। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা ছেলেমানুষি, কিছুটা অভিমান আর অনেকটাই স্মৃতি। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালো লাগতো, ভাবতে ভালো লাগতো। ডাইরির পাতায় কত আঁকিবুঁকি, কত কাটাকুটি, কত দুষ্টুমি আছে। যতটা সম্ভব “মেঘ বৃষ্টি” তে তুলে ধরলাম।

Leave A Reply