শান্তির খোঁজে শান্তিনিকেতন ★ সুপর্ণা ঘোষ ★

শান্তিনিকেতন! আহ! যাবার আগে এক বন্ধু বলেছিলো, ” সুপর্ণা দেশ দেশান্তর ঘুরলে অথচ এখনও শান্তিনিকেতন তোমার অদেখা!” কবিগুরু বলেছিলেন,

“বহু দিন ধরে’ বহু ক্রোশ দূরে / বহু ব্যয় করি,বহু দেশ ঘুরে /দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা, /দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া /ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া /একটি ধানের শিষের উপরে /একটি শিশিরবিন্দু।”

এ যেন একদম অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে আমার জন্য। তাই একরকম হুট করেই  ঠিক হয়েছিল আমরা দুই বন্ধু দু দিনের জন্য শান্তিনিকেতন ঘুরতে যাবো।
আমার বন্ধু আসবে  দক্ষিণ কোলকাতা থেকে আর আমি বেলঘরিয়া । বেলঘরিয়া থেকে সকাল ৭.৪৫এর মাঝেরহাট লোকাল এ পৌঁছলাম চিতপুর স্টেশন।  সেখান থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হবে। রিজার্ভেশন আছে ০৯.০৫ এর রামপুরহাট ইন্টারসিটি,  ধরবো এখান থেকেই । সকাল সাতটায় কোলকাতা স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে রওনা দিলাম আমরা দুটিতে। ট্রেনের ভীড় কহতব্য নয়। বেলা বারোটা নাগাদ বোলপুর স্টেশনে পৌছে গেলাম। স্টেশনের বাইরেই পেয়ে যাবেন সারি দেওয়া টোটো রিক্সা । মনে মনে উত্তেজনা, আনন্দ নিয়ে একটা  টোটো রিক্সা নিয়ে রওনা হলাম শান্তিনেকেতনের পথে। পথে আলাপ হলো টোটোর ড্রাইভার দাদার সাথে, নাম রাজু (পুরো দিন উনি আমাদের সাথে থাকবেন , সমস্ত দর্শনীয় স্থান দেখাবেন মাত্র ৭০০ টাকায়।)।

প্রথমে আমাদের আগে থেকে বুক করে রাখা লজে গিয়ে ফ্রেস হয়ে বেরনোর প্লান থাকলেও,পথে খেয়াল হলো আমরা শান্তিনিকেতনের খুঁটিনাটি দেখা সুরুকরে ফেলেছি নিজেদের অজান্তেই। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। শাল, বকুল, কৃষ্ণচুড়া, শিমুল, কুর্চি বিভিন্ন গাছের মেলা। আমাদের টোটো রিক্সার দাদা আমাদের নিয়ে এগিয়ে চললেন শান্ত স্নিগ্ধ ছায়াময় রাস্তা দিয়ে। ছেলে মেয়ে, মহিলা, পুরুষ সবাই বেশীর ভাগ সাইকেল, স্কুটিতেই চলাচল করছে।হুট করে চোখে পরল প্রাচীন বট বৃক্ষ। না জানি কত ইতিহাসের মৌন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে নানা রঙের কাচের বর্ণিল ছটায় উৎভাসিত প্রার্থনা গৃহ। প্রতি বুধবার ভোরে এখানে প্রার্থনা করা হয়। তিন পাথরি বটগাছ। এখানে বসে কবি অনেক কবিতা লিখেছেন। তখন কোপাই অনেক কাছে ছিলো। এখানেই রচিত হয়, ” ঐ চলেছে গরুর গাড়ী, বোঝাই করা কলসিহাড়ী”!

তালধ্বজ!
“তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে”!
এই কবিতা এই তালগাছ দেখেই লিখেছিলেন। সে তাল গাছও দেখা গেল মাটির এক বাড়ির মাথা ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে। রবি ঠাকুর নাম দিয়েছিলেন, তালধ্বজ বাড়ি।এইরকম করে গল্প শুনে শুনে হেঁটে হেঁটে ঘুরে দেখলাম শান্তিনিকেতন।

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুরের জমিদার ভূবন মোহন সিংহ এর নিমন্ত্রন রক্ষা করতে যাবার পথে এই ভূবন ডাঙ্গার মাঠে জোড়া ছাতিম গাছের নিচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এবং এখানে তিনি ” প্রানের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি” পেয়েছিলেন। রায়পুরার জমিদারের কাছ থেকে তিনি ১৬ আনার বিনিময়ে ২০ বিঘা জমি পাট্টা নেন। বর্তমানে ৭ই পৌষ সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে উপাসনা হয় সেই ছাতিম গাছদুটো মরে গিয়েছে। সেখানে নতুন দুটি ছাতিম গাছ রোপন করা হয়।

এরপর চলে গেলাম শান্তিনিকেতন ভবন ও বিপরীতদিকে অবস্থিত মিউজিয়ামে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ সালে শান্তিনিকেতন ভবনটি তৈরি করেন।দেবেন্দ্রনাথ তিনটি স্ট্রাকচারে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। ভবনটি একদিক থেকে দেখলে মনে হবে মন্দির, অন্য দিক থেকে দেখলে মসজিদ, আরেক দিক থেকে দেখলে গির্জা।ছাতিম তলা হচ্ছে শান্তিনিকেতনের মূল জায়গা। এখান থেকেই শান্তিনিকেতনের সৃষ্টি। বর্তমানে জায়গাটিতে ঘেরা রয়েছে । বছরে মাত্র দুইবার খোলা হয় এই ছাতিম তলা।


১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঁচ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই ছাতিম তলায় পাঠদান শুরু করেন। যার নাম দেন বিশ্বভারতী বিদ্যালয়। আরও রয়েছে উদয়ন ভবন। এখানে কবি, কবি পুত্রবধু বাস করেছেন। বর্তমানে রবীন্দ্র যাদুঘর। টিকিট কেটে, আমরা দুজন প্রবেশ করলাম। কবির ব্যাবহৃত বিভিন্ন জিনিস-পত্র, বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া উপহার, চিত্র, নোবেল প্রাইজের রেপ্লিকা এসব দেখতে।

হাঁটতে হাঁটতে প্রতিমুহূর্তে যখন মনে করছিলাম এখানে এক সময় হেঁটে বেড়িয়েছেন রবিঠাকুরও, নিজের অজান্তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। দেখা মিললো রামকিঙ্কর বেইজের করা বিখ্যাত ভাস্কর্য ‘কলের বাঁশি।’ দুই সাঁওতাল রমণীর কারখানায় কাজে যাওয়ার দৃশ্য। এছাড়া রবি ঠাকুরের জন্য তৈরি করা বাসস্থানগুলো ঘুরে তাঁর বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন দেখে নিতে পারেন। জীবদ্দশায় রবি ঠাকুর পুনশ্চ, কোনার্ক, উদীচী, শ্যামলী এবং উদয়ন-এই পাঁচটি বাড়ি ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে শ্যামলী সম্পূর্ণ মাটির ঘরের আদলে বানানো। কোনার্ক নামের বাড়িটির ডিজাইন কবিগুরু নিজে করেছিলেন। তবে বাড়িগুলোর মধ্যে উদয়ন সবচেয়ে বড়। এর আসবাবপত্রে প্রাচীন বৌদ্ধস্থাপত্যের ছাপ খুঁজে পাবেন। দুপুরে ক্যান্টিনে আহারের জন্যে কিছুটা সময় বাদ দিলে আমরা বিকাল অবধি সারাক্ষন বিশ্বভারতী ও মিউজিয়াম টাই ঘুরে ঘুরে দেখলাম ও নতুন জ্ঞান আহরণ করলাম।

বেলা যখন ২.৪৫ আমরা পৌঁছলাম লজে, চেক-ইন করে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে টোটো করে বেরিয়ে পড়লাম। দুপুর অনেকটা হয়েছে তাই আগে গেলাপ দুপুরের খাবার খেতে। রাজু দা আমাদের নিয়ে গেলেন  “আমার হেঁসেল” এ, খাবারের অর্ডার দিলাম। আহা! কি স্বাদ! মনে রাখার মতো, বিশেষ করে গাওয়া ঘি. মিল সিস্টেম বা আমরা যাকে থালি বলি, পরিবেশন এর ধরণও চোখ টানে। পেট ও মন পুরে খাওয়া দাওয়া হল।

এরপর গেলাম শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘আমার কুটির’। নানা জিনিসের পসরা সজ্জিত এই প্রতিষ্ঠানকে হস্তশিল্পের কার্যালয় হিসেবে গণ্য করা হয়।এরপর আমরা গেলাম প্রকৃতি ভবন নেচার আর্ট মিউজিয়াম। অপূর্ব সুন্দর বিভিন্ন ধরনের কারুকার্য ও খোদাই শিল্পের অপূর্ব সম্ভার দেখে মন ভোরে।এরপর গেলাম ‘সৃজনী শিল্পগ্রাম’ নামক আরেকটি দর্শনীয় স্থানে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যগুলোর মানুষের জীবনযাত্রা, শিল্প সংস্কৃতির এক অপূর্ব সহাবস্থান রয়েছে এখানে।

রাস্তায় চোখে পড়ল রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত ‘আমাদের ছোট নদী’ বা কোপাই নদী। বিকেল বেলা চলে এলাম অপূর্ব সুন্দর খোয়াই এর হাটে যা প্রতি শনিবার বসে। বিভিন্ন জিনিসের স্বল্পমূল্যে এত ভালো পসরা আপনাকে আকৃষ্ট করবেই। শুরু হলো আমাদের সোনাঝুরি হাট পরিক্রমা। জঙ্গলের মধ্যে লাল মাটির ওপর এই হাটের বেচা কিনি সঙ্গে মাদলের তালে ধামসা নাচ খুব এনজয় করলাম সঙ্গে রকমারি হাতের তৈরি টুকিটাকি, শান্তিনিকেতন ক্ষেত শাড়ী, ব্যাগ, আর ঘর সজ্জার জন্য কিছু কেনাকাটি। ।

লজে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল, সারাদিনের ঘোরাঘুরি আর ধকলে শরীর বেশ ক্লান্ত। আমাদের লজের পরিবেশও বেশ মনোরম। পরদিন ঘুম ভাঙতেই আমরা লজের পেছনের জঙ্গলটা একটু ঘুরে দেখে এলাম। আজ ফেরার পালা, বেলা ১২ টায় ট্রেন। ঠিক করি ফেরার পথে আমাদের নাদেখা কয়েকটা জায়গা ঢুঁ মেরে ফিরবো। কথামত প্রথমে গেলাম বাংলাদেশ ভবন। এখানে রয়েছে দুই বাংলার নানা জানা অজানা ইতিহাস, বাঙ্লাদেশের পরিচিত বেশ কিছু লেখকের বই এর সংগ্রহশালা। এরপর আমরা চললাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে। স্টেশন পৌঁছে টিকিট হাতে নিয়ে ঘরির দিকে তাকিয়ে দেখি এখনও হাতে বেশ কিছুটা সময় রয়েছে। পিঠের ব্যাগ পিঠে নিয়েই চললাম স্টেশন এর একদম বিপরীতে অবস্থিত বোলপুর মিউজিয়াম। যতটা ভেবেছিলাম তার থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সেখানে আছে রবী থেকে রবী ঠাকুর হয়ে ওঠার গল্প, সেখানে আছে ছেলে থেকে ভাই, বন্ধু, স্বামী, পিতা হওয়ার টুকরো টুকরো গল্প। জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি রবীন্দ্রনাথকে ভীষণ কাছের থেকে অনুভব করতে চাইলে এখানে আসতেই হবে ।

এবারের মত আমরা ফিরে চললাম, কিন্তু

আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে — এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;

 

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

About Author

Megh Ghosh

“মেঘ বৃষ্টি” আসলে আমার ডাইরির পাতা। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা ছেলেমানুষি, কিছুটা অভিমান আর অনেকটাই স্মৃতি। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালো লাগতো, ভাবতে ভালো লাগতো। ডাইরির পাতায় কত আঁকিবুঁকি, কত কাটাকুটি, কত দুষ্টুমি আছে। যতটা সম্ভব “মেঘ বৃষ্টি” তে তুলে ধরলাম।

Leave A Reply