আমার ছোটবেলার নববর্ষে

সেই ছোট্ট বেলা থেকে আমার নববর্ষ কেটেছে অন্য রকম ভাবে।এখনও খানিকটা সেরকমই থেকেও বিস্তর বদলেছে। বছরের প্রথম দিনটি বেশ খানিকটা দূর্গা পূজা বা স্বরসতী পূজার সকালের মতোই ছিল। সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে, চিত্র সেলে কেনা জামা কাপড় পরে বেশ সেজে গুঁজে মা এর সাথে বাবার দোকান পৌঁছে যেতাম। পয়লা বৈশাখে চিরদিনই বাবার দোকানে লক্ষী গণেশ পূজা হয়। দুটি জিনিসে আমার ভারী মন খারাপ হত। প্রথমটি, আমার বাবার দোকানের কোনো বোর্ড বা নাম লেখার ব্যবস্থা কিছুই নেই।দোকান বন্ধ থাকলে অপরিচিত কারোর পক্ষেই সম্ভবনা সেটি কে খুঁজে পাওয়া। বাবার বক্তব্য ছিল “চেনা বামুনের পৈতে লাগেনা”, উনার ধারণা এই নাম না লেখা বা না থাকাটায় লোকের চিনতে পাড়ার কারণ। দ্বিতীয়টি, আমার বাবার দোকানের আসে পাশে ওপর নিচে সমস্ত দোকান সেদিন ফুলে,আলোয় ঝাঁ চক চক করছে। সব গুলির মাঝখানে আমার বাবার দোকান ম্যেরমেরে অন্ধকার। বাবার উপর বেশ রাগই হত ।খালি গোল গোল রংবেরংয়ের কদম ফুল আর আমের শাখা সুন্দর কৌশলে একটার পর একটা বেঁধে, তারপর সেটা টাঙানো হত দোকানের সাটারের একদম অপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত।ওই অতটুকুই। সকালে যখন সবাই দোকানে গাঁদা গোলাপ রজনীগন্ধা টাঙাচ্ছে, আমি তখন একটা টুলে বসে হা করে সেসব দেখছি আর মনে মনে ভাবছি, বাবা তো একটা বই এর দোকান বা সোনার দোকান করতে পারত, তাহলে আমরাও এরকম ফুলে ফুলে সাজতাম। ঘটনা চক্রে আমার বাবার তামাক ও পাতার (বিড়ির পাতা মশলা) ব্যবসা। বাবার কাছে নিজের দুঃখের কথা জানালেই বাবা বলতেন আমার দোকানে ফুল লাগলে লোকে হাসবে তো। আমার দোকানে আসবে চাচা, কাকা , যারা ফুল দেখে খুশি হওয়ার থেকে একটা বড় প্যাকেট মিষ্টি পেলে বেশি খুশি হবে। চিরদিনই আমার বাবা মিষ্টির প্যাকেট করতেন না ।মিষ্টির কৌটো করতেন।একমাত্র করা পাকের মিষ্টি আর সেগুলো কমকরে 10 /12 টা থাকতো এক একটি কৌটতে, আর থাকত কোলড্রিক্স অথবা আইসক্রিম।নববর্ষ উপলক্ষে মাসি রা আসতেন।তাদের নিয়ে আমি আর মা সকালে পূজার পর রাতে আবার যেতাম বাবার দোকানে ওই ইসক্রীম আর কোলড্রিক্স খেতে।

এই ঘটনায় আরো একটা কথা মনে পড়ল।আমি মিষ্টি বিশেষ পছন্দ করিনা। মিষ্টির মধ্যে কেবল লাড্ডুটা আমি খায়। সেই বিষয়টি আমার বাবার জানাছিল। এই সমস্ত পূজার দিনে ভিক্ষারীদের আগমন অন্য দিনের থেকে কিছু বেশিই হয়। পূজার দিন তাদের ফেরানো অমঙ্গলের, তাই তাদের জন্য আনা হত লাড্ডু, কিন্তু ব্যাপারটি আমার ছিল অজানা।শেষ বার যেবার নববর্ষে বাড়িতে ছিলাম,সকাল থেকে আমার একদম এক রুটিন চললো। রাতে হল এক কান্ড। বাবা রাত 10 টাই বাড়ি ঢুকে আমার হাতে দিলেন একটি বেশ বড় প্যাকেট,তাতে রয়েছে লাড্ডু। জিজ্ঞাসা করলাম -তুমি লাড্ডুও করো নাকি ?
উত্তরে- হ্ম্ম ভিক্ষারী দের জন্য করি, বেঁচেছিল তাই তোকে দিলাম। 😂😂😂.

বেশ কেটেছে ছেলে বেলা। আর আজ এক বসে বসে টিভি তে নববর্ষের প্রোগ্রাম দেখছি,আর ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থন করছি।

About Author

“মেঘ বৃষ্টি” আসলে আমার ডাইরির পাতা। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা ছেলেমানুষি, কিছুটা অভিমান আর অনেকটাই স্মৃতি। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালো লাগতো, ভাবতে ভালো লাগতো। ডাইরির পাতায় কত আঁকিবুঁকি, কত কাটাকুটি, কত দুষ্টুমি আছে। যতটা সম্ভব “মেঘ বৃষ্টি” তে তুলে ধরলাম।

Leave A Reply