এক দিনের সফরনামা বেথুয়া ফরেস্ট ও মায়াপুর ★ সুপর্ণা ঘোষ ★

শীতকাল আমার ভীষণ প্রিয়। হয়তো সেকারণেই ভাস্কর বাবু আমাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা?” ।শীতকাল ভাবলেই মনে আসে পীঠে, শীত মানে ডালের বড়ি, শীত মানে মিঠে রোদ মেখে ছাদে বসে খিচুরি, শীত মানে মেলা, ঘোরাঘুরি, কেক, চড়ুইভাতি, ছুটি, বিয়ে বাড়ি, নিউ-ইয়ার, সরস্বতী পূজা, ভ্যালেন্টাইন ডে, আরও কত কি। এমনি একটা শীতের সকালে আমরা বেড়িয়ে পরলাম কোলকাতা থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত মায়াপুর ধাম এর উদ্দেশ্যে। এ বছর কোলকাতায় শীত পড়েছে বেস জাঁকিয়ে। সেসব তুরি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আমরা মোট চোদ্দ জন চললাম এক দিনের এই সফরনামায়।

গন্তব্য মায়াপুর হলেও সকলে মিলে পরিকল্পনা করে স্থির করা হল আমরা প্রথমে যাব বেথুয়া অভয়ারণ্য। সেখান থেকে পিছিয়ে আসবো মায়াপুর ধাম। সেখানে ঘোরাঘুরি, দুপুরে প্রসাদ খাওয়া, ও সন্ধ্যেই আরতি দেখে আমরা আবার শুরু করবো ফেরার পথ চলা।সকাল ছটাই আমাদের যাত্রা শুরু হল বেলঘড়িয়া থেকে। আমাদের এক সহযাত্রী ও তার পরিবার আমাদের সাথে যুক্ত হবেন রানাঘাট থেকে। কলকাতা থেকে মায়াপুর দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। মায়াপুর যাওয়ার বেশ কয়েকটি পথ রয়েছে তবে আমরা চললাম – কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে – কাঁচড়াপাড়া- হরিণঘাট আরডি থেকে বড়জগুলি – রানাঘাট – শান্তিপুর – কৃষ্ণনগর – মায়াপুর।রানাঘাট পর্যন্ত রাস্তা যথেষ্ট শালীন তবে রানাঘাট থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার রাস্তাটি গর্তে পূর্ণ। এমন সুন্দর দিনের উপ্রি পাওনা রোদ ঝলমলে সকাল, রোববারের শান্ত রাস্তা, সাথে গুরের গন্ধ……

রাস্তায় কখনো ফ্রুট ব্রেড, কলা, কখনো কাঁচা গোল্লা, কখনো কমলা লেবু সহযোগে জলখাবার ও সময় দুটোই কাটানো গেল। বেথুয়া যখন পৌঁছলাম সময় তখন বেলা বারোটা। বেথুয়া অরণ্যের প্রবেশ দ্বারের বাম দিকে টিকিট ঘর। মাথা পিছু ৫০ টাকা করে টিকিট। টিকিট কেটে আমরা হৈ হৈ করে ছুটে চললাম অরণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। যারা শান্ত নির্জনতা পছন্দ করেন তাদের জন্য এমন একটি যায়গা যথার্থ। আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর হাত ধরে গুটি গুটি হেঁটে যাওয়া, পাতার ফাঁকে উকি দেওয়া পাখির আওয়াজ, আর বুক ভরা স্নিগ্ধ বাতাস আপনার কাটানো প্রত্যেকটা মুহূর্ত কে করে দেবে অসামান্য। এই ফরেস্ট-এ পশ্চিমবঙ্গ বন বিভাগের অন্তর্গত কিছু গেস্ট হাউস রয়েছে এবং বন বিভাগের ওয়েবসাইটে অনলাইনে এগুলি বুকিং করা যেতে পারে। এই বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যটি পরিবার বা বন্ধুদের সাথে এক রাতে থাকার জন্য সত্যিই ভাল, সকালে স্নিগ্ধতা ও সন্ধ্যার পরে এই জায়গাটি কালো রঙের অন্ধকারের সাথে খুব রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে, আমরা এই অভয়ারণ্যে, ময়ূর, বিভিন্ন ধরণের পাখি, নীলগাই, ঘড়িয়াল ইত্যাদি দেখতাম। হরিণ দেখার ভীষণ ইছে থাকলেও তা পূরণ হলনা। কৃষ্ণনগর,  বেথুয়াডহরী থেকে বাসে ৪৫ মিনিটের দূরত্বে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে ও এসে পৌঁছন যায় এই বেথুয়া স্টেশনে এবং স্টেশন  থেকে টোটোতে এই অভয়ারণ্যে পৌঁছাতে মাত্র ১৫ – ২০ মিনিট সময় লাগে।

অরণ্যে আলোড়ন শেষ করে  আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম মায়াপুরের উদ্দেশ্যে। মায়াপুরে পৌঁছে আমরা পেলাম একেবারে আলাদা পরিবেশ। রুটিনে বাঁধা শহুরে জীবন থেকে একটি মনোরম বিরতি। ভক্তদের (রাশিয়ানরা, ব্রাজিলিয়ানরা অন্তর্ভুক্ত) চন্দ্রদয় মন্দিরে ‘হরে কৃষ্ণ’ জপ করতে দেখে মন প্রসন্ন হতে বাধ্য। ধুতিতে ও ঘাগরাতে ছোট বাচ্চাদের (ভারতীয় ও বিদেশী) হরে কৃষ্ণের জপ করতে দেখে মজা পেলাম বিস্তর।

এখানে পৌঁছতে সময় লাগলো আল্প।  দুপুর ২.৩০ নাগাদ পৌঁছে আমাদের প্রথম কাজ ছিল প্রসাদ গ্রহন। এখানে ঈশ্বরের কাছে দেওয়া খাবার অর্থাৎ ভোগ পরিবেশন করা হয় খাবারের সাথে মিশিয়ে। দুর্দান্ত মানের খাবার  ( খিচুড়ি, ডাল, ভাত, সবজি, চাটনি ) এবং এই দুপুরের খাবারের জন্য নেওয়া হয়  ৪০ টাকা করে। নিরামিষ খাবারটি এমন সুস্বাদু যা আপনার পেট মন দুই দেবে ভোরিয়ে। পরিষেবাটিও বেশ ভাল এবং পরিষেবার ধরণ আপনাকে আশ্চর্য করবে। একটি বড় হল ঘরে প্রায় ৫০০ লোক একসাথে বসে প্রসাদ খান। সে দৃশ্যও কম আকর্ষণীয় নয়।

খওয়া দাওয়ার পর আমরা বেড়িয়ে পরলাম নবদ্বীপ ঘুরে দেখতে। মায়াপুর প্রধান মন্দিরের থেকে ৩ অথবা ৪ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। একটি বেশ বড় অর্থাৎ প্রায় ১৫ জন বসার মত টোটো জাতীয় গাড়ি ভাড়া করে আমরা চললাম সেসমস্ত জায়গা ঘুরে দেখতে। শ্রী চৈতন্য দেবের জন্মস্থান, মাসির বাড়ি, ল্যব্রেরি, মিউজিয়াম ইত্যাদি। সন্ধ্যেই ৬ টার মধ্যে ফিরে এসে আমরা প্রবেশ করলাম প্রধান মন্দিরে। সেখানে আরতি দেখে ও টুকটাক জিনিস কিনে সময় হল সন্ধ্যে ৭.৩০। শ্রীকৃষ্ণ ও চৈতন্যের ভূমি, অত্যন্ত শান্ত ও স্বচ্ছন্দ। মন্দিরের ভজন ও কীর্তন আপনার আত্মাকে স্পর্শ করবে। আপনি এখানে আরও ২ দিন থাকতে পারেন। ইসকনের ভবনে একত্রে থাকার ব্যবস্থা খুব ভাল,  কেবল খাঁটি নিরামিষ খাবার এখানে পাওয়া যায়।

ঘড়িতে যখন ৭.৪৫ আমরা সকলে আবার গাড়িতে চরে বসলাম। এবার আমরা ফিরে যাব জীবনের প্রয়োজনে আমাদের প্রত্যেক দিনের নিয়মে বাঁধা জীবনের দিকে…

 

 

 

 

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

About Author

Suparna Ghosh

“মেঘ বৃষ্টি” আসলে আমার ডাইরির পাতা। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা ছেলেমানুষি, কিছুটা অভিমান আর অনেকটাই স্মৃতি। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালো লাগতো, ভাবতে ভালো লাগতো। ডাইরির পাতায় কত আঁকিবুঁকি, কত কাটাকুটি, কত দুষ্টুমি আছে। যতটা সম্ভব “মেঘ বৃষ্টি” তে তুলে ধরলাম।

Leave A Reply