ইতি নিয়তি ★ সুপর্ণা ঘোষ

ওঠ্, মা।
-মা, আর একটু ঘুমোতে দাও না।
-পাগলী মেয়ে। উঠে পড়। ওদিকে তোর বর উঠে পড়েছে হয়ত।
মায়ের শেষ কথায় এক ঝটকায় পৃথিবী’র সমস্ত আলো যেন চোখে আছড়ে পড়ল সুমি’র। চোখ খুললেও মায়ের দিকে ফিরল না। মা তখনও মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। শেষের দিকের মায়ের কথা গুলো আর কানে ঢুকল না, নিজের হৃদপিণ্ডের আওয়াজ আর ফুঁপোনোর নিঃশ্বাস ছাড়া।
রোজের দিনের মত আজও ডাইরি নিয়ে বসল সুমি, কে জানে পরে আর লিখতে পারবে কিনা! ডাইরি’র ওপরের দিকে ২০১১ লেখা আছে। বাড়ির মধ্যে থেকেই শঙ্খ আর উলুধ্বনি এর আওয়াজ ভেসে আসছে।
তেমন কিছু লেখার আগেই মা আবার এল।
– সুমি খৈ দই হবে ,একটু খেয়ে নে। সারাটা দিন আজ তোর উপোস যে।
-উপোস কি করতেই হবে?
– দূর পাগলী! আজ যে তুই মা লক্ষী আর জামাই হবে নারায়ণ ! তাই আজ নারায়ণ সেবায় তোর উপোস।
ডাইরি’তে “আজ আমার বিয়ে…” ছাড়া আর কিছুই লেখার আগেই সবাই হৈ হৈ করে এসে ওর প্রাইভেসি’টাই ভেঙে দিল।
লাল পাড়ের হলুদ তাঁতের শাড়ী ,রক্ত রাঙা আলতা আর মাথায় সোনার মুকুট। নাপিত হাতে শাখা পরিয়ে দিতেই সকলে মিলে হলুদ ছোঁয়ালো। ।সদ্য স্কুলের গন্ডি পেরোনো সুমি হটাৎ করে কেমন বোবা হয়ে গেলো। বাড়ীর পুজোর সময় ও এরকম শাড়ী আলতা পড়ে তৈরি হত। কিন্তু আজকের সাজের গন্ধ’টা কেমন ‘কুঁড়ি থেকে ফুল ফোটার মত’।নিজেকে শকুন্তলার মত মনে হচ্ছে। সানাইয়ের শব্দে সকলের মাঝেই সুমির চারিদিক’টা আবছা হয়ে উঠল।
ফুলের আর পারফিউমের গন্ধে মো মো করছে পুরো বাড়ি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুমি নিজেকে চিনতে পারলনা।ভারী বেনারসি’তে নিজের বয়স’টা ঢাকা পড়েছে, আয়না যেন বলছে ‘আজ আঠেরোর উদ্ভিন্ন যৌবনা তুমি’।
শ’দেড়েক বরযাত্রী নিয়ে বড় এলো, কত আয়োজন সানাই, ফুল,হৈচৈ ,তা সত্তেও সুমি কেমন যেন একা ।বুক টা দুর-দুর করছে.. আনন্দে নাকি অজানা আশঙ্কা বোঝা দায়!
রাত ১.৩০
পান পাতা সরল ,চোখে চোখ শুভদৃষ্টি। তারপর মালা বদল, সিঁদুর দানের সময় মেয়েটির বাম চোখ থেকে এক বিন্দু জল গাল বেয়ে নিঃশব্দে লজ্জা বস্ত্রে হারিয়ে গেল।।
আহ্..বাবা’রে….
ঘুম ভাঙল গত রাতে দুঃস্বপ্নের ধাক্কায়। আজও সুমি সকল থেকে উপোস করে আছে, কিন্তু আজ কারণ’টা আলাদা।
ডান হাতের কব্জি আর বাম কানটা যন্ত্রনা করছে।ডাইনিং আর বাথরুম এর স্পেসে’র কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি।তাহলে কি আজ থেকে সব মিথ্যে!
কিন্তু সব কিছু কে যে ও ভীষণ ভালোবাসে। খাটের বাম পাশ’টা, টেবিলের উপরের ফুলদানি ,রান্না ঘরের বেঁকে যাওয়া খুন্তি , ওই আলমারির নতুন শাড়ী গুলোর গন্ধ আর খুব কাছের থেকে আসা নাক ডাকার শব্দ ! সব কিছুই যে ও ভীষণ ভালোবাসে..তাহলে আজ থেকে কি সব পর হয়ে গেল??
অপমান যন্ত্রনা আর বিশ্বাস-ঘাতকতা নিয়ে আজ সে ফিরে যাবে ওর জন্ম ভিটা’য়। আগেও গেছে কিন্তু এবারের টা আর আগন্তুকের মত না।
মনে মনে ভাবল দোষ কোথায় ছিল তার!
সেদিন মাঝ রাতে পা টিপতে টিপতে দু বার ঢুলে পরে ছিল বলে ! নাকি ওর মোজা টা খুঁজে দিতে একটু দেরি হয়ে গেলো সেই জন্য ।নাকি রোববার শাকে নুন’টা একটু বেশি দিয়েছিল তার জন্য, কিংবা পরশু রাতের অত্যাচার তা সহ্য করতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠেছিল “ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও আর কোনোদিনও হবে না” বলে।
কোনটা???
চিৎকার করে বুক ফাটতে চাইলো..পারল না।
আজ স্বামী তার অন্য কারোর নারায়ণ হয়েছে ,আর সেদিনের লক্ষ্মী আজ হয়েছে দাসী।
সব-বার এই বাড়ি থেকে নিজের বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় সুমি’র চোখের কোন গুলো হাল্কা চিক্ চিক্ করত রোদে। কিন্তু এবারে ও মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসলে গালের মাংসগুলো যেমন কুঁচকে যায় তেমন ভাবেই গালের ভাঁজ গুলো কুঁচকে যাছে। থুতনি’টা কাঁপছে। গোঙানি’টা কেমন গলায় এসে আটকে যাছে মনে হচ্ছে। এত বড়ো আকাশ’টা কালবৈশাখীর মেঘ ছাড়া যে এত কালো আবছা, আর ছোট হতে পারে, এই প্রথম অনুভব করল সুমি।
-চল মা। খাবি চল।
-ইচ্ছে নেই মা, তুমি যাও।
-লক্ষী মেয়ে আমার। চল্ মা। দু-দিন ধরে কিছুই তো খাস্ না।
-আজ একটু উপোসে থাকি না মা!
-বাবা, নিচে ডাকছে। তাড়াতাড়ি আয়।
মা কাঁপা কাঁপা গলায় রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
সুমি’র হটাৎ করে ওর সেই পুরনো ডাইরি’র কথা মনে পড়ল।
ধুলো ঝেড়ে ডাইরি টা বের করল।
লাস্ট লেখা’টা কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেছে। আসলে এতদিনের পর তো, তাই হয়ত ডাইরির পাতা গুলো হলদেটে হয়ে গেছে। তবে লেখা’টা এখনও জ্বল জ্বল করছে।
“আজ আমার বিয়ে…”। পাশে কালী ঠাকুরের ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাল একবার সুমি।
২০১৩।
★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

About Author

“মেঘ বৃষ্টি” আসলে আমার ডাইরির পাতা। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা ছেলেমানুষি, কিছুটা অভিমান আর অনেকটাই স্মৃতি। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালো লাগতো, ভাবতে ভালো লাগতো। ডাইরির পাতায় কত আঁকিবুঁকি, কত কাটাকুটি, কত দুষ্টুমি আছে। যতটা সম্ভব “মেঘ বৃষ্টি” তে তুলে ধরলাম।

Leave A Reply