বুলগেরিয়া থেকে বকখালি ★ সুপর্ণা ঘোষ

সবে মাত্র দুর্গাপূজার ছুটি কাটিয়ে কলকাতা ফিরেছি। ভারি মন নিয়ে আপিস যাই আসি, মনে আনন্দ নেই, কাজে মন নেই, কোন উৎসাহ নেই। কালীপূজার দিকেই তাকিয়ে আছি একরকম। এমন সময় আপিসের এক সহকর্মী থেকে প্রস্তাব এল, “চল কালীপূজা দীপাবলির ছুটিতে টুক করে কাছে পিঠে কথাও ঢু মেরে আসি”। এ প্রস্তাব যেন এক ঘর ঘন অন্ধরারে এক টুকরো লিকলিক করে জ্বলা মোমবাতির আলো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্ল্যান আর চাপা একটা উত্তেজনা। হাতে দুই দিন, ৭ই ও ৮ই নভেম্বার, গন্তব্য বকখালি, আমরা যাবো ছয় (৬) জন। প্রথমে ঠিক হলো যাওয়া হবে ট্রেনে। শিয়ালদা থেকে নামখানা লোকাল (ভাড়া মাথাপিছু মাত্র ২৫ টাকা) তারপর নদী পেরিয়ে অন্য পার থেকে বাস বা গাড়ি ভাড়া (বাস ১১ টাকা/ ভাড়া গাড়ি ৩৫০-৪৫০) করে বকখালি। ইতিমধ্যে আমাদের গ্রুপের একজন হাত তুলে জানিয়ে দিলো, সে যেতে পারছেনা। প্রথমে একটু থমকে গেলেও পরে ব্যাপারটা এরকম হল – আমাদের গ্রুপের একজন প্রস্তাব দিল, আপাতত যেহেতু আমরা ৫ জন তাই আমরা চাইলে সে তার সদ্য কেনা নতুন চার চাকা বিশিষ্ট গাড়ি নিয়ে যেতে রাজি। আমাদের কেবল মাত্র দিতে হবে গাড়ির খোরাক, অর্থাৎ জ্বালানি তেলের টাকাটা ( মাথা পিছু ৩০০ টাকা)। আমরা এক লাফে প্রস্তাবটা মাছে চার গেলার মত গিলে, দিন গুনতে লাগলাম।

৭ই নভেম্বর, অ্যালার্ম দিয়েছিলাম সকাল ৬টায়, ঘুম ভাঙল ৫.১৫। উত্তেজনায় কিছু আগেই ভেঙ্গেছে আরকি। আমি থাকি বুলগেরিয়া, যেতে হবে গড়িয়া (ভয় পাবেন না, আমি কলকাতার গায়ে এক টুকরো বুলগেরিয়ার থুড়ি বেলঘরিয়ার কথা বলছি)। সকাল ৭ টায় পেটে জলখাবার আর পিঠের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। লোকাল ট্রেনে যাব দমদম, সেখান থেকে মেট্রোতে যাব গড়িয়া তারপর সেখান থেকে গাড়িতে করে যাবো বকখালি। সেই মত হাতে ১ঘণ্টা নিয়ে বেরিয়েছি। বেরিয়েই আকাশ দেখে বেশ ভয় হল। এক আকাশ মেঘ করেছে, এই বুঝি বৃষ্টি শুরু হয় হয়। ফোনে ‘গু’গুলে আবহাওয়া সম্পর্কে তথ্য নিলাম, গুগুল বলল আজ কিন্তু কপালে বৃষ্টি আছে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ৭.৩২সে এলো রানাঘাট শিয়ালদা লোকাল। দমদম পৌঁছে মেট্রো করে গড়িয়া পৌঁছলাম ৮.২০তে। পৌঁছে দেখি বৃষ্টি শুরু হয়েছে মুষলধারে। আমাদের গাড়ি এসে গেছে একদম মেট্রো স্টেশনে। একটি ছাতায় মাথা বাঁচিয়ে গুটিগুটি পায়ে তিনজন উঠে পড়লাম গাড়ির ভেতর। শুরু হল যাত্রা।

‘মেঘবৃষ্টি’ দেখে বেশ বিরক্ত লাগলেও সহকর্মী বন্ধুদের পেয়ে আর ঘুরতে যাওয়ার আনন্দে সে সব ভুলেই গেলাম। গাড়ি প্রথম থামলো ডায়মণ্ড-হারবারে। এখানে আমরা ব্রেকফাস্ট সারলাম ঘুঘণী মুড়ি, অমলেট আর চা সহযোগে (৫ জনের ১৫৫ টাকা)। ডায়মণ্ড-হারবারের এই রাস্তায় সুলভ শৌচালয়ের বেশ অভাব। সাগরিকা নামের গেস্ট হাউসে এটির ব্যবস্থা থাকলেও আজ তা বন্ধ। অগত্যা ব্রেকফাস্ট শেষ করে এটির সন্ধানে দু পা এদিক ওদিক করতে হল। ইতি মধ্যে বৃষ্টি থেমে বেশ ফুরফুরে আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। হাল্কা বাংলা গান আর আড্ডা পুনরায় যাত্রা শুরু। নামখানা যখন পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে বাজে ১২.৪৫। এখানে ফেরিতে হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পেরিয়ে আমরা যাবো অন্য পারে (নদীর নাম আমাদের অজানা ছিল, গুগুল বলল এটির নাম হাতানিয়া-দোয়ানিয়া)। ঘাট পার হতে মাথাপিছু লাগে মাত্র ২টি টাকা কিন্তু আমাদের সাথে আছে চার চাকা বিশিষ্ট গৃহপালিত গাড়ি। গাড়ি পারাপারের জেটি আলাদা। গাড়ি পারাপারে লাগলো ১৯০টা টাকা। এখানে বলে রাখি গাড়ি বা বাইক পারাপারের জন্য এই ভিন্ন জেটিতে বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হয়, তাই গাড়ি বাইক নিয়ে যেতে চাইলে হাতে সময় নিয়ে আসবেন। নদী পেরিয়ে বকখালি পৌছতে সময় লাগলো আরও ২০টি মিনিটের মত। আমরা থাকবো ‘হোটেল সংযোগে’ (sanjog)। ঝকঝকে ঘর, গাড়ি রাখার সুন্দর যায়গা, সমুদ্র থেকে মাত্র ৫টি মিনিটের রাস্তা। দুপুর ১২টায় চেক-ইন ও আউট। ঘর নেওয়া হল ২টি (প্রতি ঘর ৫৫০ টাকা)। হোটেলে ব্যাগ পত্র রেখেই আমরা প্রথমে গেলাম মধ্যাহ্ন ভোজন সারতে। দুজন ডিম ভাত, আর বাকি ৩ জন মাছ ভাত (৫ জনের ৩৬০ টাকা)।

সমুদ্রের ধারে এসে দেখি ওমা!! কোথায় সমুদ্র? কোথায় জল? বালি ধুধু করছে!! মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। সমুদ্র দেখতে এসে শেষে মরুভুমি দেখে ফিরতে হবে? আশেপাশের দোকানে জিজ্ঞাসা করা হল-

#আমরা: “মশাই, একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন?”
*দোকানী: “জলপাই? জলপাই এখন কোথায় পাবেন? এ ত জলপাইয়ের সময় নয়।
#আমরা: না না, আমি তা বলিনি
*দোকানী: জলপাই চাচ্ছিলেন কিনা, তা ত আর এখন পাওয়া যাবে না, তাই বলছিলুম
#আমরা: না হে আমি জলপাই চাচ্ছিনে
*দোকানী: চাচ্ছেন না ত ‘কোথায় পাব’ ‘কোথায় পাব’ কচ্ছেন কেন ? খামকা এরকম করবার মানে কি ?
#আমরা: আপনি ভুল বুঝেছেন‒ আমরা জল চাচ্ছিলাম
*দোকানী: জল চাচ্ছেন তো ‘জল’ বললেই হয়‒ ‘জলপাই’ বলবার দরকার কি ? জল আর জলপাই কি এক হল ? আলু আর আলুবোখরা কি সমান ? মাছও যা মাছরাঙাও তাই ? বরকে কি আপনি বরকন্দাজ বলেন ? চাল কিনতে এসে চালতার খোঁজ করেন ? বকখালি তে কি খালি বক দেখা যায়?
#আমরা: ঘাট হয়েছে মশাই । আপনার সঙ্গে কথা বলাই আমার অন্যায় হয়েছে ।
*দোকানী: অন্যায় তো হয়েছেই । দেখছেন সবে দোকান খুলছি, তবে জল‌‌ই বা চাচ্ছেন কেন ? লোকের সঙ্গে কথা ক‌‌ইতে গেলে একটু বিবেচনা করে বলতে হয়।

আপনারা হয়তো ভাবছেন, একই? এত সুকুমার রায়ের অবাক জলপানের কথোপকথন। হ্যাঁ, আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা লিখতে লিখতে দোকানীর কাছে জলের খাবর অংশটি লেখার সময় গুরুদেব সুকুমার রায়ের কথা মনে পড়লো, তাই একটু মজা করলাম মাত্র।

আশেপাশের দোকানে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল, ভাটার জন্য জল পিছিয়ে গেছে, রাতে আবার জোয়ার এলে জল পাবেন। ওই দূরে জল চকচক করছে দেখে আমরা হাটা শুরু করলাম। প্রায় ২-৩ কিমি হাঁটার পর জল পাওয়া গেল কিন্তু সে জল আর আমার বাড়ির পাশের ডোবার কোন তফাৎ নেই। যাই হোক স্থির হল আমরা এখন যাবো হেনরিজ আইল্যান্ড। আপনারা যারা এক বছর আগে হেনরিজ আইল্যান্ড গেছেন তাদের জানিয়ে রাখি, সেদিনের আর আজকের হেনরিজ আইল্যান্ডের অনেক পার্থক্য। ঝা চকচকে রাস্তা, দু-ধারে রং বেরঙের ফুলের গাছ, সাজানো বাগান, কটেজ ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রবেশের সময় বিকেল ৪টে। ৪.১৫ এর মধ্যে এলে তবেই টিকিট পেলেও পেতে পারেন। এখানে আছে একটি ওয়াচ-টাওয়ার, ফাঁকা সমুদ্র সৈকত, ছোট্ট ওভার-পুল, পরিতক্ত জাহাজ খণ্ড, গোছান ফুল বাগান, সব মিলিয়ে ফোটগ্রাফির আদর্শ যায়গা।

হেনরিজ আইল্যান্ড থেকে বেরিয়ে আমরা ফিরে চললাম বকখালির দিকে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা সহযোগে সুস্বাদু বাংলার নতুন শিল্পর চপ আর বেগুনি, বেশ কিছুটা সময় আড্ডা মেরে ও আর এক রাউন্ড চা খেয়ে টাকা মিটাতে গিয়ে শুনলাম আমরা চপ খেয়েছি মোট ৭৮ টাকার। বেশ শীত শীত করছিল, তাই ঠিক হল সমুদ্র যাওয়ার আগে আমরা একবার হোটেলে ঢুকে টুকটাক গরম জামা পড়ে নেবো।

সমুদ্র সৈকত যখন পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে সন্ধ্যে ৭টা। জল বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছে। সৈকতে সারিসারি চেয়ার রাখা, তারই মধ্যে ৫টিতে আমরা পাঁচ জন বসে পড়লাম ( প্রতি চেয়ার পিছু ঘণ্টায় ১০ টাকা, ২ ঘণ্টা কি তার বেশিই বসে ছিলাম)। দেখতে দেখতে জল এসে পা ভিজিয়ে দিলো। আমার বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল। উল্লাসে ছুপছুপ করে খানিক জলে দাপাদাপি করে চেয়ার নিয়ে পিছিয়ে এলাম। জল আবারো চেয়ার ছুয়ে গেল, আমরা আবার পেছলাম। এখানে সমুদ্র শান্ত, হুঙ্কার নেই, উচ্ছাস নেই, যেন এক মিষ্টি লক্ষ্মী মেয়ে। সমুদ্রের ধারে ছোট ছোট দোকান, সামুদ্রিক মাছ, কাঁকরা, বেলুন, আলোর বল, ফুচকা, চাট ইত্যাদি। আমরা ফুচকা খেলাম, আর সাথে নিলাম কাঁকড়া ফ্রাই (১০০ টাকা প্লেট)।

এবার টুকটুক করে হোটেল ফেরার পালা। রাস্তায় নিয়ে নেওয়া হল রাতের খাবার, হোটেল বনশ্রী থেকে। পাশাপাশি দুটি হোটেল, একটি আদি বনশ্রী ও একটি বনশ্রী। হয়তো আগে একটাই হোটেল ছিল, ভাইয়ে ভাইয়ে হয়তো দন্দের ফোলে দুই ভাগ হয়েছে। কাঁকড়া কেনার সময় আমরা দোকানদার কে ভালো হটেলের কথা জিজ্ঞাসা করলে উনি বলে দিলেন এই বনশ্রীর কথা, সাথে সাবধান করলেন ‘আদি’ বনশ্রী নাম হলেও এটি মোটেই আদি নয়, বরং খাবারের মান খারাপ। বনশ্রীর সামনে গাড়ি থামিয়ে রুটি ও তরকা নেওয়া হল, সাথে খাওয়ার জল (২০০ টাকা)।

৮ তারিখ সকালে ঘুম ভাঙল সকাল ৬টায়। প্ল্যান ছিল সকালে বিচে গিয়ে মর্নিং ওয়াক ও তারপর জলখাবার খেয়ে সমুদ্রে একটু দাপাদাপি। কথামত সকলে রেডি, একজন ছাড়া। অনেক সেধেও তাকে যখন ঘুম থেকে তোলা গেলনা অগত্যা আমরা ৪ জল চললাম সমুদ্রের দিকে। পারকিং এ গাড়ি রেখে চায়ের দোকানে চা খেয়ে নামবো বিচে। সমুদ্রের দিকে এগিয়ে দেখি জল আবার সরে গেছে। ঠিক হল জল আসা ও আমাদের আর এক সঙ্গী ঘুম থেকে উঠে সমুদ্র পাড়ে আসা অব্ধি সমুদ্র পাড়ের জঙ্গলে ঘুরবো। সকালে সমুদ্রের ধারে তখন এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। লম্বা লম্বা গাছ আর গাছের ফাঁকে সাজানো কাটা ঝোপ হাল্কা কুয়াশায় শীতের ওম গায়ে মেখে আড়িমুড়ি ভেঙ্গে, এক অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।

বেলা ৮.৩০ নাগাদ জল যখন বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছে, আমরা তখন সমুদ্র পাড়ের একটি দোকানে সবাই মিলে ব্রেকফাস্ট করতে বসলাম। ততক্ষণে হোটেলে ফেলে আসা সঙ্গীটি এসেগেছে। ডাব, এগ ম্যাগি, কোল্ড কফি (মোট ৩৩০ টাকা), দোকানের সদ্য বিবাহিত মেয়েটির বেশ লাজুক অথচ মিষ্টি চাউনি আমাদের নজর কাড়লো। খাওয়া শেষ করে আমরা চললাম সমুদ্রে ঝাপাতে।

সমুদ্রে আধা স্নান করে যখন ঘরে ফিরলাম তখন ঘড়িতে ১১ টা। স্নান করে রেডি হওয়ার পালা। ১২ টায় হোটেল থেকে ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে তুলে আমরা চললাম দুপুরের খাবার খেতে। সকলে নিলাম ডিম ভাত। গত দিনের মাছ ভাত আমাদের বেশ ভয় পাইয়ে ছিল। সমুদ্রের ধারে মাছ ভাল হবে আশা করলেও আশা হত হয়েছিলাম সন্দেহ নেই। তবে বনশ্রী আমাদের বেশ খাতির করেই খাওয়ালো (৫ টা মিল ৩০০ টাকা)।

এবার আমাদের ফেরার পালা। ফেরার রাস্তাতেও ফেরি পার হতে হল ( ভাড়া ৬০ টাকা)। ঠিক হল ডায়মন্ড হারবারে আমরা দাঁড়াব এবং সেখানে আমাদের খরচার হসাব করা হবে। সেখানে যখন পৌঁছলাম তখন বেলা ৩.৩০। মশলা চা নিয়ে হিসেবে বসে দেখা গেল দুদিনে আমাদের মাথা পিছু খরচ মাত্র ৯৬৯ টাকা। এর থেকেও বেশি আশ্চর্যের ব্যাপার হল যে রাস্তা আমরা গেছি ৫ ঘণ্টায় তা এলাম মাত্র পৌনে তিন ঘণ্টায়। আড্ডা, গান, খুনসুটি করতে করতে কখন যে কলকাতা পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারিনি। আবার সন্ধায় ফিরে এলাম আমার ঘরে, বুলগেরিয়াতে (বেলঘরিয়াতে)।

★★ Please make a comment using Facebook profile ★★

About Author

“মেঘ বৃষ্টি” আসলে আমার ডাইরির পাতা। কিছুটা কল্পনা, কিছুটা ছেলেমানুষি, কিছুটা অভিমান আর অনেকটাই স্মৃতি। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালো লাগতো, ভাবতে ভালো লাগতো। ডাইরির পাতায় কত আঁকিবুঁকি, কত কাটাকুটি, কত দুষ্টুমি আছে। যতটা সম্ভব “মেঘ বৃষ্টি” তে তুলে ধরলাম।

Leave A Reply